ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যাংকিং

ওয়াল স্ট্রিটের সবচেয়ে বড় পাঁচ ব্যাংক হলো জেপি মরগান চেজ, ব্যাংক অব আমেরিকা, সিটিগ্রুপ, গোল্ডম্যান স্যাকস ও মরগান স্ট্যানলি।

ওয়াল স্ট্রিটের সবচেয়ে বড় পাঁচ ব্যাংক হলো জেপি মরগান চেজ, ব্যাংক অব আমেরিকা, সিটিগ্রুপ, গোল্ডম্যান স্যাকস ও মরগান স্ট্যানলি। এর মধ্যে বেশির ভাগই পরিচিত বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতের জায়ান্ট হিসেবে। যদিও ব্যাংকগুলোর মোট আয়ে বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ের অবদান এখন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। মূলত ট্রেডিং কার্যক্রমের ওপর ভর করেই আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকগুলো।

বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ব্যাংকিং কার্যক্রম এখন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিগত ১৪ প্রান্তিক তথা সাড়ে তিন বছর ধরে ব্যাংকগুলোর আয়ে বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ের হিস্যা ক্রমেই হ্রাস পেয়েছে। সামনের দিনগুলোয়ও এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার জোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি সামনের বছরগুলোয় মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক খাতকে আরো চাপে ফেলে দিতে পারে।

মার্কিন ব্যাংকগুলো চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) আয় প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করছে আজ। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো প্রকাশের পর আরো এক দফা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ব্যাংক খাতে ধীরগতি দেখা যাবে। তবে সম্মিলিত আয়ের হিসাবে ট্রেডিং বিভাগ সে ধীরগতি পুষিয়ে দেবে।

এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জুনে শেষ হওয়া প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পঁাচ ব্যাংকের সম্মিলিত ট্রেডিং আয় দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার, যা বিনিয়োগ ব্যাংকিং থেকে আসা সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।

বিশ্লেষকরা আরো পূর্বাভাস দিয়েছেন, এ পাঁচ ব্যাংকের ট্রেডিং আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি হবে। তবে একই সময় বিনিয়োগ ব্যাংকিং থেকে আয় প্রায় ১০ শতাংশ কমে ৭৫০ কোটি ডলারে নেমে আসতে পারে।

২০২২ সালের শুরু থেকে বিনিয়োগ ব্যাংকাররা ওয়াল স্ট্রিটের আয়ে অবদান রেখেছেন এক-চতুর্থাংশের বেশি। অবশ্য খুচরা ব্যাংকিং ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাত থেকে আসা আয় এ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত নয়। বর্তমানে সব মিলিয়ে, মার্কিন ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতে আয় ২৫ শতাংশের সীমা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্তত ২০১৪ সালের পর থেকে এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ট্রেডিং ও বিনিয়োগ ব্যাংকিং—উভয়ই অস্থির প্রকৃতির ব্যবসা। তা সত্ত্বেও বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদি এ দুর্দশা ইঙ্গিত দেয়, ২০২১ সালে কভিড মহামারীজনিত আর্থিক বাবলের পর থেকে নতুন ব্যবসায়িক চুক্তি ও পুঁজিবাজার কার্যত স্থবির হয়ে আছে। একই সঙ্গে ট্রেডিং ব্যবসার শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। খাতটি বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ের তুলনায় ২০১০-এর দশকে দুর্বল ছিল। তখন কম সুদহার ও নিম্নমাত্রায় দামের অস্থিতিশীলতা আয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

সাধারণত বাজারে অনেক লেনদেন ও দামের ওঠানামা বেশি হয়, তখন ব্যাংকগুলোর ট্রেডিং ও বিনিয়োগ-সম্পর্কিত পরিষেবা থেকে আয় বেশি হয়। আর্থিক পরিষেবা সংস্থা ওপেনহাইমার অ্যান্ড কোম্পানির গবেষণা বিশ্লেষক ক্রিস কটোওস্কি বলেন, ‘এখনকার পরিবেশটাই স্বাভাবিক। ২০১০-এর দশকে যে কম অস্থিতিশীলতা ছিল, সেটাই আসলে অস্বাভাবিক ছিল।’

গত তিন বছরে আর্থিক বাজারগুলো একাধিক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। উচ্চ সুদহার, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফিরে আসা পর্যন্ত নানা বহুমুখী ঘটনার= প্রভাবে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সৃষ্ট রক্ষণশীল বাণিজ্যনীতির সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। এ একই প্রবণতাগুলো কোম্পানির নির্বাহীদের এবং বিনিয়োগ সংস্থাগুলোর জন্য ব্যবসায়িক চুক্তির সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তবে ব্যাংকাররা আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য চুক্তির ব্যাপারে এখনো আশাবাদী।

ক্রিস কটোওস্কি বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ের জন্য ২০২৫ সালে আর কোনো সুখবর নেই। হ্যাঁ, আপনি শরৎকালে নতুন শেয়ার ইস্যু থেকে একটি শক্তিশালী প্রান্তিক পেতে পারেন এবং তা আর্থিক প্রতিবেদনকে শক্তিশালী দেখাতে সাহায্য করবে। তবে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) কার্যক্রম মূলত আগেই ঘোষিত চুক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করবে।’

বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ের আয়কে ট্রেডিংয়ের তুলনায় বেশি মূল্যায়ন করেন। কারণ এটি উচ্চ মার্জিন ও তুলনামূলকভাবে কম মূলধননির্ভর। তারা এখনো আশা করছেন বিনিয়োগ ব্যাংকিং পুনরুদ্ধার শিগগিরই বাস্তবায়ন হবে। এরই মধ্যে গোল্ডম্যান স্যাকসের শেয়ারদর প্রথমবারের মতো ৭০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

এইচএসবিসির বিশ্লেষক সাউল মার্টিনেজ বলেন, ‘দ্বিতীয় প্রান্তিকের প্রথম ভাগ বেশ কঠিন ছিল। তবে স্পষ্টভাবেই অনেক বেশি আশাবাদ রয়েছে।’

তবে বিনিয়োগকারীরা যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আশা করছেন, সেটি হয়তো বাজারের অস্থিরতা কমিয়ে দিতে পারে। যা এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর ট্রেডিং আয়কে চাঙ্গা করে রেখেছে। ট্রেডিং থেকে অর্জিত আয় সম্পর্কে মার্টিনেজ বলেন, ‘এ খাতে আয় অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং আপনি কি খুব জোর দিয়ে বলতে পারেন যে এখান থেকে আরো প্রবৃদ্ধি হবে? আমার সন্দেহ আছে।’

জেপি মরগান ও সিটি তাদের আয় প্রতিবেদন প্রকাশ করবে আজ। ব্যাংক অব আমেরিকা, গোল্ডম্যান ও মরগান স্ট্যানলি প্রতিবেদন দেবে আগামীকাল।

ওয়েলস ফারগোকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদের দিক থেকে ছয় বৃহত্তম ব্যাংক গ্রুপের সম্মিলিত আয় বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। সবচেয়ে বড় পতনটি হতে পারে জেপি মরগানের। বিশ্লেষকরা পূর্বাভাসে বলেছেন, ব্যাংকটির নিট আয় কমবে ৩০ শতাংশ।

আরও